Lectio divina
লেক্সিও ডিভিনার আধ্যাত্মিকতা
ল্যাটিন শব্দ ‘লেক্সিও ডিভিনা’ -এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘ঐশবাণী পাঠ’। এটি বাইবেল তথা ঈশ্বরের বাণী পাঠ ও ধ্যান করার একটি পুরনো পদ্ধতি যেখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করার মানসে বার বার শাস্ত্র থেকে পাঠ করা হয়। আসলে ‘লেক্সিও ডিভিনা’ হচ্ছে খ্রিস্টানদের একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন যার মাধ্যমে ঈশ্বরের বাণীকে পাঠ করে, শ্রবণ করে, তার মাধ্যমে প্রার্থনা, ধ্যান করে নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করা হয় অর্থাৎ ব্যবহার করা হয়।
ফ্রাইয়ার লূক ডাইসিঙ্গার বলেন যে, এটি একটি বহু পুরনো শৈল্পিক পদ্ধতি যা এক সময় বস খ্রিস্টীয় অনুসারী-ই অনুশীলন করতো। এটি ধীর লয়ে শাস্ত্র পাঠ করে গভীর ধ্যানময় প্রার্থনা যেখানে বাইবেল-ঈশ্বরের বাণী জীবন্ত হয়ে উঠে, ঈশ্বরের সাথে মিলিত হওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠে। যদিও এটি বেনেডিক্টিন সন্ন্যাসীদের মধ্যে বেশি প্রচলিত ও জীবন্ত ছিল তথাপি আজকের আধুনিক সময়ে এই ‘লেক্সিও ডিভিনা’ অনুশীলনটি শুধু কাথলিকদের মধ্যে নয়, কিন্তু অন্যান্য মন্ডলীর সদস্যদের মধ্যেও তা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং তারা তা চর্চা করছে।
‘ল্যাক্সিও ডিভিনা’একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন। এটি বাইবেলের অংশ বিশেষ পাঠ করে ধ্যান-প্রার্থনা করার পদ্ধতি। এর জন্য একটি সময় নির্ধারণ করতে হবে, একটি সুন্দর ও উপযুক্ত পরিবেশ বা জায়গা নির্বাচন করতে হবে, না থাকলে সৃষ্টি করতে হবে যাতে শান্তিপূর্ণ, নিরব পরিস্থিতিতে মনোযোগ দিয়ে শাস্ত্রবাণী পাঠ, ধ্যান ও প্রার্থনা করা যায়।
চারটি ধাপে এই আধ্যাত্মিক পরিচর্চা বা অনুশীলন করা হয়। ধাপে ধাপে ঈশ্বরের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের প্রয়াস চালানো হয়। নি¤েœ সেগুলো উল্লেখ করা হল:
(১) শাস্ত্রীয় বাণী পাঠ: শাস্ত্রীয় বাণী হচ্ছে ঈশ্বরের বাণী। এটি ধীরে ধীরে অর্থপূূর্ণভাবে পাঠ করতে হবে। এটি যেন অনেক অপেক্ষার, প্রতীক্ষার পর পাওয়া ভালবাসার চিঠি-ঈশ্বরের চিঠি আমাদের জন্য। এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকতে হবে, প্রদর্শন করতে হবে। গভীর আগ্রহ নিয়ে পড়তে হবে। এমনভাবে পড়তে হবে যেন তার প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও অর্থ বুঝা যায়, আস্বাদন করা যায়। এটি ততক্ষণ পড়তে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তার কোন শব্দ বা বাক্য আমি আমার অন্তরে শুনতে পাই, আমার অন্তরে প্রবেশ করে আমাকে স্পর্শ করবে, আকর্ষণ করবে, আমার ভাল লাগবে অথবা আমাকে বিরক্ত করবে, মনে নাড়া দিবে। এই বাণীর মাধ্যমে ঈশ্বর আমার সাথে কথা বলেন, নিজেকে আমার কাছে প্রকাশ করেন। তাই আমার একান্ত চেষ্টা থাকতে হবে যেন বাণীটি যা পড়া হচ্ছে তা আমি যেন হৃদয়ঙ্গম করতে পারি, অন্তরে ধারণ করতে পারি।
(২) চিন্তা/ধ্যান করা: শাস্ত্রীয় বাণীর যে শব্দ বা বাক্যাংশ আমাকে স্পর্শ করেছে, আলোড়িত করেছে তা নিয়ে কিছু সময় নিরবে চিন্তা বা ধ্যান করা। এটিকে ধীরে ধীরে আমার অন্তরের গভীরে প্রবেশ করানো। তাকে নিয়ে সম্পূর্ণরূপে মনোনিবেশ করা আর না করতে পারা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। এই শব্দ বা বাক্য দিয়ে এই মূহূর্তে ঈশ্বর আমাকে কি বলতে চান, কি খবর-সংবাদ দিতে চান বা আমার কাছ থেকে কি চান বা দাবী করেন প্রভৃতি শুনতে ও বুঝতে চেষ্টা করা।
(৩) প্রার্থনার দ্বারা উত্তর প্রদান: আমার বাছাই করা শাস্ত্রীয় শব্দ বা বাক্যের উপর চিন্তা ও ধ্যানের ফলে আমার অন্তরে, আমার মধ্যে যে অনুভূতি আসে তা আমি প্রার্থনার আকারে, প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে প্রকাশ করি। আমার একান্ত অন্তরের কথা তাঁকে বলি। এই প্রার্থনা হতে পারে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতার, কোন কিছুর জন্য অনুনয়-বিনয়, উদ্দেশ্যমূলক বা সার্বজনীন, খুব কাতর প্রার্থনা বা প্রশংসাসূচক ও স্তুতিবাচক। পবিত্র শাস্ত্র থেকে ঈশ্বরের কথা শুনে, ধ্যান করে আমি আমার হৃদয়ের কথা, আমার চাহিদা-প্রয়োজন তাঁকে বলি। এভাবে ঈশ্বরের সাথে আমার কথোপকথন বা আলাপ হয়।
(৪) গভীর মনন ধ্যান: অন্তরের নিরবতা ঈশ্বরের ভালবাসা ও শান্তির মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিবেদন করা। নিজের হৃদয়-আত্মার দরজা ঈশ্বরের জন্য সর্বদা খোলা রাখা। শব্দ বা কথা দিয়ে নয়, তার উর্ধ্বে গিয়ে হৃদয় দিয়ে নিরবতায় ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ করা, কথা বলা। নিরবে হৃদয়ে তিনি কথা বলেন।
সাধ্বী তেরেজা বলেন, ‘লেক্সিও ডিভিনা অন্তরে ঈশ্বরের বাণী ধারণ করার ফলে নির্গত ধ্যান, নিরব প্রার্থনা, ঐক্যের প্রার্থনা, পরিপূর্ণতার প্রার্থনা। এসব ঈশ্বরের উপস্থিতিতে তাঁর প্রতি আমাদের অভিজ্ঞতা গভীরতর করা।’
আধ্যাত্মিক দিক
ঈশ্বরের বাণী শ্রবণ: লেক্সিও ডিভিনা হল প্রধানত পবিত্র শাস্ত্র শ্রবণের মাধ্যমে ধ্যান-প্রার্থনা করা। বার বার পাঠ করার মাধ্যমে ঈশ্বরের বাণী শ্রবণ করা হয়। শাস্ত্রের ঐ পাঠ করা অংশের মাধ্যমে ঈশ্বর আমাদের কি বলতে চান তা অন্তরে শ্রবণ করা, তা আবিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়।
ঈশ্বরের বাণী ধ্যান: লেক্সিও ডিভিনায় ঐশবাণী শ্রবণের পর তা নিয়ে ধ্যান করা হয়। ধ্যানে ঈশ্বরের নির্দেশিত পথ, আদেশ আমরা খুঁজে পাই। ঐশবাণী আমাদের আলোকিত করে।
ঈশ্বর অভিজ্ঞতা: লেক্সিও ডিভিনা অনুশীলণ করে, ঐশবাণী শ্রবণ ও ধ্যান করে আমরা ঈশ্বরের শক্তি ও উপস্থিতি উপলব্ধি করি, ঈশ্বর অভিজ্ঞতা লাভ করি।
ঈশ্বরের সাথে কথোপকথন: লেক্সিও ডিভিনায় ঐশবাণী পাঠ, শ্রবণ ও ধ্যান করে আমরা ঈশ্বরের কথা শুনি। প্রার্থনার মাধ্যমে আমরা নিজেদের কথা তাঁকে বলি। অর্থাৎ তাঁর সাথে আমাদের কথোপকথন হয়। প্রার্থনার মাধ্যমে নিজের হৃদয়ের কথা ঈশ্বরকে জানানো: ঐশবাণী শুনে আমরা যখন ধ্যান করি তখন আমাদের অন্তরে, হৃদয়ে কিছু উপলব্ধি হয়; কোন কিছুর অভাব অনুভুত হয়। আমরা তা প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরের কাছে তুলে ধরি।
ঈশ্বরের সাথে গভীরতর সম্পর্ক স্থাপন: লেক্সিও ডিভিনায় ঐশবাণী শ্রবণ ও ধ্যান করা হয় আর প্রতি উত্তরে হৃদয়ের কথা, উপলব্ধি প্রার্থনার মাধ্যমে ঈশ্বরকে জানানো হয়। ফলে ঈশ্বরের সাথে গভীরতর সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি: লেক্সিও ডিভিনায় ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি হয়, বিশেষভাবে ঐশবাণী ধ্যানের মাধ্যমে।
ঈশ্বরের কাছে আত্মনিবেদন: ঐশবাণী ধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধি হয় যে ঈশ্বর কত মহান আর আমরা কত নগন্য। তাতে ঈশ্বরের কাছে আত্মনিবেদন করার বাসনা আসে এবং মানুষ আত্মনিবেদন করে।
রূপান্তরিত হওয়া: ঐশবাণী ধ্যান ও প্রার্থনার মাধ্যমে একজন মানুষ পরিবর্তিত হয়, রূপান্তরিত হয়। সে নতুন মানুষ হয়ে উঠে।
প্রার্থনার প্রতি আগ্রহী হওয়া: লেক্সিও ডিভিনা চর্চা করে একজন ভক্ত প্রার্থনার স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। ফলে সে প্রার্থনার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে।
ঐশবাণীর আলোকে জীবন যাপন: ঐশবাণী শ্রবণ ও ধ্যান করে ভক্ত নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারে। সে ঐশবাণীর আলোকে নিজের জীবন পরিচালনা করে।
খ্রীষ্টের প্রকৃত শিষ্য/শিষ্যা হয়ে উঠা: ঐশবাণীর আলোকে জীবন যাপন করে ভক্ত খ্রীষ্টের প্রকৃত শিষ্য/শিষ্যা হয়ে উঠে। খ্রীষ্টের নির্দেশিত পথে সে চলে।
ঐশবাণী মানব জীবনে জীবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠে: ভক্ত যখন ঐশবাণী ধ্যান করে তা নিজের জীবনে পালন করে, পদে পদে তা মেনে চলে, জীবন যাপন করে তখন ঐশবাণী তার জীবনে জীবন্ত ও কার্যকর হয়ে উঠে।
ঈশ্বরের সান্নিদ্ধে বাস: ঐশবাণীর আলোকে জীবন যাপন করে ভক্ত ঈশ্বরের সান্নিধ্যে, ঈশ্বরের সাথে বসবাস করে।
Comments
Post a Comment